বাংলার মহাকবি হেমচন্দ্র

মাইকেল মধুসূদন দত্তের মৃত্যুর পর থেকে বাংলার সাহিত্যগগনে রবীন্দ্রনাথের আগমনের পূর্বপর্যন্ত যে দু’টি নক্ষত্র আমাদের আলো দেখিয়েছেন তাঁরা হলেন নবীনচন্দ্র সেন এবং হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য হল মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য। কিন্তু বাংলায় আরও কয়েকটি মহাকাব্য রচিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বৃত্রসংহার কাব্য অগ্রগণ্য।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে বৃত্রসংহার, মেঘনাদবধ এর চেয়েও উৎকৃষ্ট। মেঘনাদবধ কাব্যের সমালোচনায় তিনি লিখেছেন “হেমবাবুর বৃত্রসংহারকে আমরা এইরূপ নাম-মাত্র-মহাকাব্য শ্রেণীতে গণ্য করি না, কিন্তু মাইকেলের মেঘনাদবধকে আমরা তাহার অধিক আর কিছু বলিতে পারি না।”
হেমচন্দ্র একজন দেশপ্রেমিক কবি ছিলেন। তাঁর লেখায় দেশপ্রেম এবং পরাধীনতাবিরোধী মনোভাব দেখা যায়। ১৮৭২ সালে এডুকেশন গেজেট পত্রিকায় তার ভারতসঙ্গীত কবিতা প্রকাশিত হয়। এই কবিতায় তিনি স্পষ্ট ভাষায় পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ভারতবাসীদের আহ্বান জানান। কবিতাটি দীর্ঘকাল বঙ্গের জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদায় আসীন ছিল। তারপর যা হবার তাই, ব্রিটিশ সরকার কবির উপর রুষ্ট হন। এডুকেশন গেজেট পত্রিকার সম্পাদক ভূদেব মুখোপাধ্যায়কে এই কবিতা প্রকাশের জন্য জবাবদিহি করতে হয়।
হেমচন্দ্র তৎকালীন সমাজের বিধবাদের প্রতি অবহলোর প্রতিবাদ করেছিলেন তাঁর লেখায়। তাঁর লেখা কুলীন মহিলা বিলাপ কবিতাটি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বহুবিবাহরোধ আন্দোলনে সহায়ক হয়েছিল। হেমচন্দ্রের প্রথম কাব্যগ্রন্থ চিন্তাতরঙ্গিনী (১৮৬১)। এছাড়া আশাকানন, ছায়াময়ী, দশমহাবিদ্যা, চিত্তবিকাশ প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা। তাঁর খণ্ড কবিতার সংকলন কবিতাবলী দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়। শেক্সপীয়রের টেম্পেস্ট, রোমিও জুলিয়েট সহ কিছু অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করেন তিনি। তবে তাঁর শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম বৃত্রসংহার মহাকাব্য।
হেমচন্দ্র ১৮৩৮ সনে হুগলি জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন। জুনিয়র ও সিনিয়র উভয় গ্রেডে তিনি বৃত্তিলাভ করেন। এল এ ডিগ্রি লাভ করে তিনি আইনজীবী হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করেন। শেষ জীবনে কবি অন্ধ হয়ে যান এবং আর্থিক সংকটে পড়েন। ১৯০৩ সালের ২৪শে মে অসহায় এবং নিঃস্ব অবস্থায় তিনি মারা যান। শিল্পিত মহাকাব্য এবং উদ্দীপনাময়ী জাগরণবাণীর জন্য হেমচন্দ্র বাংলা সাহিত্যে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

“বাজ রে শিঙ্গা বাজ এই রবে,
শুনিয়া ভারতে জাগুক সবে,
সবাই স্বাধীন এ বিপুল ভবে,
সবাই জাগ্রত মানের গৌরবে
ভারত শুধু কি ঘুমায়ে রবে?”
(ভারত সঙ্গীত, হেমচন্দ্র)

তথ্যসূত্র: ১। হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, আমীনুর রহমান, বাংলাপিডিয়া ২। সমালোচনা, মেঘনাদবধ কাব্য- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ৩। বাঙলা ছন্দের ইতিবৃত্ত, মতীয়র রহমান বক্তৃতামালা, আবদুল কাদির

 

সংগ্রহ:
অভিজিত দাস। শিক্ষা সভার সদস্য ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরকৌশল বিভাগে অধ্যয়নরত।

Advertisements

আপনার মতামত দিন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: